আজ - শনিবার, ১৪ই মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ১লা চৈত্র, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ, ২৫শে রমজান, ১৪৪৭ হিজরি, (বসন্তকাল), সময় - রাত ১:৪১

যশোর ‎মণিরামপুরে ব্যাঙ্গের ছাতার মতো গড়ে উঠেছে ফার্মেসী-লাইসেন্স,ফার্মাসিস্ট ছাড়াই চলছে রমরমা বানিজ্য ‎

স্টাফ রিপোর্টার(যশোর):
‎যশোরের মণিরামপুরে প্রশিক্ষিত ফার্মাসিস্ট ছাড়াই গোটা উপজেলার অলিতে-গলিতে ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে উঠেছে আড়াই হাজারের বেশি ফার্মেসী। ঔষধ প্রশাসনের নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে শুধু ট্রেড লাইসেন্স নিয়েই চালিয়ে যাচ্ছে ওষুধ বিক্রির ব্যবসা। এসব ফার্মেসী চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র ছাড়াই উচ্চমাত্রার অ্যান্টিবায়োটিক, নিষিদ্ধ, নকল, মেয়াদোত্তীর্ণ ও নিম্নমানের বিভিন্ন ওষুধ বিক্রি করছে অবাধে। এতে আর্থিক, শারীরিক ও মানসিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়ে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছেন অনেক রোগী ও তাদের পরিবার। এখানকার মানুষ প্রতিনিয়ত অপচিকিৎসার শিকার হচ্ছেন। ফলে মণিরামপুরের ৪ লক্ষ বাসিন্দা স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছেন। এ ছাড়া ভয়ংকর বিষয় হচ্ছে- বেশ কিছু ওষুধের দোকানে ওষুধ ব্যবসার আড়ালে ঘুমের ট্যাবলেট ও বিভিন্ন অ্যালকোহল বিক্রি করে বলে জানা গেছে। যশোরের ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী, মণিরামপুরে নিবন্ধিত ফার্মেসী রয়েছে ১৫০০-১৬০০টি । তবে নিবন্ধন ছাড়া কতগুলো ফার্মেসী আছে, তার সঠিক হিসাব দিতে পারেননি তারা। বিভিন্ন সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যমতে, মণিরামপুর প্রায় আড়াই হাজারের উপরে অননুমোদিত ফার্মেসী আছে। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত কোনো ফার্মেসীতেই ফার্মাসিস্ট কিংবা কেমিস্ট নেই। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অধিদপ্তরের একজন কর্মকর্তা জানান, মণিরামপুরে কয়েক হাজার ফার্মেসী চলছে লাইসেন্স ছাড়া। এর মধ্যে প্রায় হাজার খানিক দোকান আছে, যেগুলো খুবই নিম্নমানের। স্বাস্থ্যসেবা সরঞ্জামসহ বিভিন্ন ঔষধের চাহিদা বাড়ায় এসব দোকানের ব্যবসাও জমজমাট। তদারকি কম থাকায় নকল, মানহীন, মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ ও স্বাস্থ্যসেবা সরঞ্জাম বিক্রি হচ্ছে এসব দোকানে। তবে এসব ফার্মেসীতে ওষুধ মজুত, প্রদর্শন ও বিক্রয় ১৯৪৬ সালের ড্রাগস রুলস ও ঔষধ ও কসমেটিকস আইন ২০২৩ অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য অপরাধ। আবার লাইসেন্সবিহীন অ্যালোপ্যাথিক ওষুধের পাশাপাশি আয়ুর্বেদী ও হোমিওপ্যাথিক ওষুধের ফার্মেসী খুলে বসেছেন অনেকে। তবে ফার্মেসী পরিচালনার জন্য যে ন্যূনতম যোগ্যতার প্রয়োজন তাও আবার অনেক ফার্মেসী মালিকদের নেই। উপজেলার কয়েকটি ফার্মেসীতে সরেজমিনে গিয়ে জানা যায়, তারা ফার্মেসী ব্যবসা শুরু করার আগে অন্যের ফার্মেসীতে কাজ করেছেন দীর্ঘদিন। সেখান থেকে অভিজ্ঞতা অর্জন করে নিজেই শুরু করেছেন ফার্মেসী ব্যবসা। অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত ১০ বছরে ফার্মেসীতে ভুল চিকিৎসায় ৭ জন রোগী মারা গেছেন। ২০২২ সালের ২৩ ডিসেম্বর কুলটিয় এলাকার এক ফার্মেসিতে ভুল চিকিৎসায় একই এলাকার একজন মারা যায়। এ ঘটনায় পুলিশ ফার্মেসীর মালিকে আটক করেছিল। পরে বাদী মামলা না করায় তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়। ২০১৮ সালে দূর্বাডাঙ্গা এলাকার এক ফার্মেসীতে ভুল চিকিৎসায় এক শিশু মারা যায়। মণিরামপুর পৌর এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এ এলাকায় অনেক বেসরকারি ক্লিনিক থাকায় অনেক নতুন ফার্মেসী গড়ে উঠেছে। এগুলোর ওষুধ সংরক্ষণ ব্যবস্থাসহ সার্বিক অবস্থা মানসম্পন্ন নয়। ফার্মেসী চালু করার জন্য বাধ্যতামূলক হচ্ছে, ঔষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর থেকে ড্রাগ লাইসেন্স নেওয়া এবং প্রত্যেক ফার্মেসীতে একজন সনদপ্রাপ্ত ফার্মাসিস্ট থাকা। অথচ বেশির ভাগ ফার্মেসীতেই নেই ড্রাগ লাইসেন্স আর সনদপ্রাপ্ত ফার্মাসিস্ট। তাদের অনেকের বিরুদ্ধে চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র ছাড়াই রোগীদের অ্যান্টিবায়োটিকসহ বিভিন্ন রোগের স্পর্শকাতর ওষুধ বিক্রিরও অভিযোগ রয়েছে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, মণিরামপুরের গ্রামপর্যায়ে ছোটখাটো ফার্মেসীগুলোতে ওষুধ ব্যবসার আড়ালে ঘুমের ট্যাবলেট ও অবৈধ অ্যালকোহল বেঁচাকেনা করা হয়। শ্যামকুর ইউনিয়নের চিনাটোলা ও সুন্দরপুর বাজারে কয়েক ফার্মেসীতে ওষুধ ব্যবসার আড়ালে অবৈধ অ্যালকোহল বেচাকেনা হয় বলে জানা গেছে। এসব কারণে ফার্মেসীর ভুল চিকিৎসায় এক শিশু মারা যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। কথা হয় অষ্টম শ্রেণি পাস এক ফার্মেসী মালিকের সঙ্গে। তিনি নিজেকে ডা. দাবি করে বলেন, এসব মিথ্যা কথা। লাইসেন্স ও ফার্মাসিস্ট আছে কি না এ প্রসঙ্গে কথা হলে তিনি বিষয়টি এড়িয়ে যান। গোপালপুর-খাটুয়াডাঙ্গা এলাকায় এক ফার্মেসীতে গিয়ে দেখা যায়, এক পাশে চা দোকান, আরেক পাশে ফার্মেসী ব্যবসা। দোকান মালিক জানান, এসব ফার্মেসীতে অধিকাংশই ডাক্তারের ব্যবস্থাপত্রের বাইরে ওষুধ সরবরাহ দিয়ে থাকেন। আর সাধারণ মানুষের ওষুধের মূল্য সম্পর্কে ধারণা না থাকায় ৫ টাকার ওষুধ ২০-৩০ টাকায় বিক্রি করছেন। এ ছাড়া ভেজাল ও নিম্নমানের ওষুধ বিক্রির ক্ষেত্রে ভালো মানের ওষুধের চেয়ে বেশি কমিশন দেওয়া হচ্ছে। এতে বেশি লাভের আশায় ভেজাল ও নিম্নমানের ওষুধ বিক্রিতে বেশি আগ্রহী হচ্ছে ওষুধ ব্যবসায়ীরা। সাধারণ মানুষও কোন ওষুধটি আসল কোনটি নকল তা চিহ্নিত করতে অপারগ। এর ফলে ভেজাল ও নিম্নমানের ওষুধের বাণিজ্য দিন দিন সম্প্রসারিত হচ্ছে। আর স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছে সাধারণ মানুষ। তথ্য সূত্রে জানা যায়, একজন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ফার্মাসিস্ট দ্বারা একটি ফার্মেসী পরিচালনার নিয়ম রয়েছে এবং ড্রাগ লাইসেন্স করার আগে ওষুধ বিক্রয় ও প্রদর্শনকারী প্রতিষ্ঠানের মালিককে অবশ্যই প্রশিক্ষণ গ্রহণ করতে হবে। কিন্তু মণিরামপুর উপজেলার বিভিন্ন হাট-বাজারসহ অলিতে-গলিতে ওষুধের দোকানে এ আইন অমান্য করা হচ্ছে। যার কারণে প্রশিক্ষণ ও ড্রাগ লাইসেন্সবিহীন ওষুধের দোকান দিন দিন বেড়েই চলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন ফার্মাসিস্ট বলেন, আমি নিজে ড্রাগ লাইসেন্সধারী ও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ফার্মাসিস্ট হিসাবে ওষুধের ব্যবসায় যে সুবিধা ভোগ করছি অথচ অনেকেই ড্রাগ আইন না মানা সত্ত্বেও একই সুবিধা পাচ্ছে।

‎খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মণিরামপুরে অধিকাংশ ফার্মেসিতে ভুয়া ও নিম্নমানের কোম্পানির ওষুধ বিক্রি হচ্ছে। ওইসব ওষুধে ১০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত ছাড় দিয়ে ওষুধ বিক্রি করা হয়। এসব ওষুধ খেয়ে রোগীরা আরও জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। সরেজমিনে একাধিক ফার্মেসী ঘুরে ভিন্ন এক চিত্র দেখা যায়, ডিগ্রিধারী, ডিপ্লোমাধারী ফার্মাসিস্ট ও ড্রাগ লাইসেন্স ছাড়াই পুরো উপজেলায় চলছে হাজার হাজার ফার্মেসী। ব্যবস্থাপত্র ছাড়া এসব ফার্মেসী থেকে বিক্রি হচ্ছে ওষুধ। এরমধ্যে অধিকাংশ ফার্মেসীগুলোতে রেজিস্টার্ড চিকিৎসকের ছাড়পত্র নেই। এ ছাড়া বড় বড় ফার্মেসীর ড্রাগ লাইসেন্স থাকলেও সেখানে নেই দক্ষ ফার্মাসিস্ট। কোনো ধরনের কেমিস্ট বা ফার্মাসিস্ট না থাকলেও সব ধরনের রোগের চিকিৎসা দেওয়া হয়। এসব ফার্মেসীতে প্রায়ই ছোট ছোট অপারেশনও করানো হয়। এবিষয়ে যশোর জেলা ঔষধ প্রশাসনের সহকারী পরিচালক,নাজমুল হাসানের মুঠোফোনে একাধিকবার কল করলেও তার সাথে যোগাযোগ করা সম্ভাব হয়নি। যশোর জেলা সিভিল সার্জন ডা.মাসুদ রানা বলেন, ‘ড্রাগ লাইসেন্স এর বিষয়টা আমাদের না।

আরো সংবাদ
স্বাস্থ্য
ফেসবুক পেজ
সর্বাধিক পঠিত