
ঝিনাইদহ টেকনিক্যাল স্কুল এন্ড কলেজের অধ্যক্ষ’র বিরুদ্ধে কেন্দ্র ও ব্যবহারিক ফির টাকা আত্মসাতের অভিযোগ
ঝিনাইদহ করেসপন্ডেন্ট,একাত্তর নিউজ২৪:
ঝিনাইদহ টেকনিক্যাল স্কুল এন্ড কলেজ পরীক্ষা কেন্দ্রে চলমান এইচএসসি (কারিগরি ও ভোকেশনাল) পরীক্ষার কেন্দ্র ফি এবং ব্যবহারিক পরীক্ষার অর্থ নিয়মবহির্ভূতভাবে খরচ দেখিয়ে আত্মসাতের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের স্পষ্ট নীতিমালা উপেক্ষা করে কেন্দ্রের অধ্যক্ষ ও ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা একক সিদ্ধান্তে অর্থ পরিচালনা করছেন বলে অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্ট অন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধানেরা।
কাগজে-কলমে কমিটি কিন্তু বাস্তবে সিদ্ধান্তহীনতার অভিযোগটি অনুসন্ধান করে জানা গেছে, ঝিনাইদহ টেকনিক্যাল স্কুল এন্ড কলেজ কেন্দ্রটিতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানসহ মোট পাঁচটি কারিগরি ও ভোকেশনাল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। অন্য ৪টি প্রতিষ্ঠান হলো, মল্লিক শহিদুল ইসলাম কলেজ, মোশাররফ হোসেন কলেজ, ঝিনাইদহ কলেজ এবং জবেদা সরোয়ার কম্পিউটার ও বানিজ্য কলেজ ঝিনাইদহ। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানসহ পাঁচটি প্রতিষ্ঠান থেকে মোট ৬০৯ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে ঝিনাইদহ টেকনিক্যাল স্কুল এন্ড কলেজের একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণি থেকে (নিয়মিত-অনিয়মিত) ১৭৯ জন, একই পর্যায়ের ঝিনাইদহ কলেজ থেকে ৮১ জন, মোশাররফ হোসেন কলেজ থেকে ১০৫ জন, মল্লিক শহিদুল ইসলাম কলেজ থেকে ২১৪ জন এবং জবেদা সরোয়ার কম্পিউটার ও বানিজ্য কলেজ থেকে ৩০ জন শিক্ষার্থী পরিক্ষায় অংশগ্রহণ করেন।
এতে লিখিত ও ব্যবহারিক পরীক্ষাসহ তিন-চারটি ধাপে শিক্ষার্থীদের পরিক্ষা ফি বাবদ টিএসসি’র শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে মোট কত টাকা নেওয়া হয়েছে তা কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আব্দুস সালাম জানাতে অনিহা বোধ করায় জানা সম্ভব না হলেও অন্য চারটি প্রতিষ্ঠানে খোঁজ নিয়ে যা জানা গেছে তা হলো, ঝিনাইদহ কলেজ থেকে ৬৮,৩৭৫ টাকা, মোশাররফ হোসেন কলেজ থেকে ৮৯,৮১৫ টাকা, জবেদা সরোয়ার থেকে ২৭০২০ টাকা এবং মল্লিক শহিদুল ইসলাম কলেজ থেকে নেওয়া হয়েছে ১,৮১,৬৯০ টাকা।
সরকারি ও বোর্ড বিধি মোতাবেক, কেন্দ্রভুক্ত এই পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের প্রধানদের সমন্বয়ে একটি “পরীক্ষা পরিচালনা কমিটি” গঠন করার আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, কেন্দ্র কর্তৃপক্ষ কাগজে-কলমে একটি কমিটি দেখালেও কার্যত অন্য চার প্রতিষ্ঠানের প্রধান বা প্রতিনিধিদের কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় শামিল করননি। কোনো সভায় না ডেকে তাদের কে আড়ালে রেখে সম্পূর্ণ পকেট কমিটি হিসেবে এটিকে ব্যবহার করা হচ্ছে।
অন্য চারটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধানদের অভিযোগ থেকে জানা গেছে, পরীক্ষার্থীদের কাছ থেকে সংগৃহীত কেন্দ্র ফি ও ব্যবহারিক পরীক্ষার টাকা কমিটির যৌথ সম্মতিতে ব্যাংকে রাখার নিয়ম। পরীক্ষা চলাকালীন বাস্তব খরচ মেটানোর পর অবশিষ্ট অর্থ নিয়ম অনুযায়ী পরীক্ষায় দায়িত্ব পালনকারী শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের সম্মানী হিসেবে বণ্টন করার কথা।
কিন্তু ঝিনাইদহ টেকনিক্যাল স্কুল এন্ড কলেজের অধ্যক্ষ এবং কেন্দ্র সচিব অন্য প্রতিষ্ঠানের কমিটির সদস্যদের সম্পূর্ণ আড়াল করে নিজেদের ইচ্ছামতো ভুয়া ভাউচার ও খরচ দেখিয়ে পুরো টাকা গায়েব করার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করার পথে চলছেন।
কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের নীতিমালা অনুযায়ী, কেন্দ্র ব্যয়ের প্রতিটি খাতের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং উদ্বৃত্ত অর্থ পরীক্ষা সংশ্লিষ্টদের মাঝে বণ্টন করা বাধ্যতামূলক। কিন্তু এখানে খরচের কোনো স্বচ্ছ হিসাব অন্য প্রতিষ্ঠান প্রধানদের দেওয়া হচ্ছে না। এমনকি কমিটিতে তাদের রাখার প্রয়োজন নেই বলেই সাফ জানিয়ে দিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ বিষয়ে মল্লিক শহিদুল ইসলাম কলেজের অধ্যক্ষ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন,”আমাদের শিক্ষার্থীদের টাকায় কেন্দ্র চলে, অথচ কেন্দ্র খরচের নামে কী হচ্ছে আমরা কিছুই জানি না। আমাদের নাম কমিটিতে রাখা হয়েছে কেবল আইনি ফাঁকফোকর গলানোর জন্য। প্রকৃতপক্ষে আমাদের কোনো মতামত নেওয়া হচ্ছে না। তিনি বলেন, গত ২জুলাই পরিক্ষা শুরু হলেও এপর্যন্ত কেন্দ্র পরিচালনার মিটিং এ আমাদের ডাকা হয়নি। তিনি ভিতি প্রকাশ করে আরোও বলেন, আমাদের শিক্ষার্থীরা সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রে পরিক্ষা দিচ্ছে। তাদের উপর কোন প্রভাব পড়তে পারে এজন্য আমরা কোন প্রতিবাদ করতে সাহস পাচ্ছিনা। তাছাড়া যেহেতু তাদের সরকারী প্রতিষ্ঠান সেহেতু আমাদের বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর বিভিন্ন কাজে দ্বারস্থ হতে হয়। তাই ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করেও এপ্রসঙ্গে আমাদের প্রতিবাদী হতে থমকে দিচ্ছে।
মোশাররফ হোসেন কলেজের প্রভাষক মনোয়ার হোসেন অভিযোগ করে বলেন, ৪টি পরিক্ষা হওয়া পর্যন্ত পরিক্ষা হলে আমাদের ভুমিকা ছিল অভিভাবকের মত! আমাদের কেন্দ্রে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। কোন শিক্ষার্থী পরিক্ষায় উপস্থিত হলো আর কোন শিক্ষার্থী উপস্থিত হলো না তার খোঁজ নিতে পারিনি। তিনি বলেন, গত জুন মাসের ২০ তারিখে কমিটি করা হলেও কাদের নিয়ে কমিটি গঠন করা হয়েছে তা আমাদের জানানো হয়নি। ২জুলাই থেকে পরিক্ষা শুরু হয়ে ৪টি পরিক্ষা শেষ হওয়া পর্যন্ত আমাদের মূল্যায়ন করা হয়নি, তবে শনিবার ১১ জুলাই কোন এক অদৃশ্য কারণে আমাদের ডাকা হয়েছে তা বোধগম্য নয়।
এই বিষয়ে ঝিনাইদহ টেকনিক্যাল স্কুল এন্ড কলেজের প্রিন্সিপাল না থাকায় রুটিন পরিচালনা কর্মকর্তা আব্দুস সালামের সাথে যোগাযোগ করা হলে তারা নিয়ম মেনেই সব করা হচ্ছে বলে দাবি করেন। তবে অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের প্রধানদের কেন কমিটিতে সক্রিয় রাখা হয়নি—এই প্রশ্নের কোনো সদুত্তর তিনি দিতে পারেননি।
এদিকে এই অনিয়মের বিষয়ে ভুক্তভোগী প্রতিষ্ঠানগুলো এবং সংশ্লিষ্ট শিক্ষকেরা কারিগরি শিক্ষা বোর্ড ও স্থানীয় প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে দ্রুত তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। তারা মনে করেন, সাধারণ শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের অধিকার রক্ষায় এই আর্থিক দুর্নীতির সুষ্ঠু তদন্ত এখন সময়ের দাবি।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিষয়টি জানাজানি হলে নড়েচড়ে বসেছেন প্রতিষ্ঠান পরিচালকরা। এই অনিয়ম আর অর্থ লুটপাটের পরিকল্পনা ঢাকতে অন্য চারটি প্রতিষ্ঠানের কাছে ভুল স্বীকার করে তাদেরকে কেন্দ্রে আসার অনুরোধ করেন প্রতিষ্ঠানের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আব্দুস সালাম