
ঝিনাইদহে সিন্ডিকেটের দখলে সরকারী খাদ্য গুদাম, ধান বিক্রি থেকে বঞ্চিত কৃষক
ঝিনাইদহ প্রতিনিধি:
ঝিনাইদহ সদর উপজেলার খাদ্য গুদামে আমন ধান ও চাল সংগ্রহে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। প্রকৃত কৃষকদের বাদ দিয়ে সরাসরি ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের মাধ্যমে খাদ্য গুদামে ধান ঢোকাচ্ছে একটি প্রভাবশালী চক্র। অভিযোগ রয়েছে, এই সিন্ডিকেটকে সরাসরি সহযোগিতা করছেন খাদ্য পরিদর্শক ও সদর খাদ্য গুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর হোসেন।
সরেজমিনে সদর খাদ্য গুদামে গিয়ে দেখা যায়, আনুমানিক ১০-১৫টি আলমসাধু ও একটি ট্রাকে করে ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে আগে থেকেই খাদ্য অধিদপ্তরের সরকারি বস্তায় ভরা কেনা ধান গুদামে ঢোকানো হচ্ছে। সেখানে দায়িত্বরত কর্মকর্তার কোনো তদারকি ছাড়াই শ্রমিকরা এসব ধান আনলোড করছেন। ফলে গুদামে নিম্নমানের, ভেজা ও চিটাযুক্ত ধান ঢোকার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে শ্রমিকরা জানান, কর্মকর্তার নির্দেশেই তারা এই ধান গুদামে ঢোকাচ্ছেন।

অনুসন্ধানে আরও দেখা যায়, ঝিনাইদহ-চুয়াডাঙ্গা সড়কের জেলখানার পাশে দুটি আলমসাধু গাড়িতে খাদ্য অধিদপ্তরের বস্তায় ধান বোঝাই করা রয়েছে। গাড়ি দুটির চালকরা জানান, শৈলমারী বাজারের ব্যবসায়ী লতিফ মিয়া ঝিনাইদহ ফুড গোডাউনে দেওয়ার জন্য এই ধান পাঠিয়েছেন এবং সরকারি বস্তাগুলো অফিস থেকেই সরবরাহ করা হয়েছে।
সরকার লটারির মাধ্যমে প্রান্তিক কৃষকদের কাছ থেকে সরাসরি ধান কেনার ঘোষণা দেওয়ায় চাষিরা লোকসান কাটিয়ে ওঠার আশা করেছিলেন। বর্তমান সময়ে সার, কীটনাশক ও জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং অসময়ের বৃষ্টির কারণে ইরি-বোরো চাষে কৃষকদের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। কিন্তু খাদ্য গুদামের অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কারণে কৃষকরা সেই সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
কৃষকদের দাবি, তাদের বরাদ্দকৃত লটারির তালিকা কৌশলে সংগ্রহ করে ব্যবসায়ীরা গোডাউনে ধান ঢুকিয়ে দিচ্ছে।
সদর উপজেলার সাগান্না গ্রামের কৃষক রহিম উদ্দিন ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, সাধারণ কৃষকরা লটারির ধান নিয়ে গুদামে গেলে নানা তালবাহানা করা হয়। ধান ভেজা, ওজনে কম কিংবা বস্তা নিয়ে নানা অজুহাত দেখিয়ে তাদের ফিরিয়ে দেওয়া হয়। ফলে বাধ্য হয়ে তারা খোলা বাজারে কম দামে ধান বিক্রি করে লোকসান গুনছেন। এছাড়া গুদাম কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর হোসেনের বিরুদ্ধে চালকল মালিকদের কাছ থেকে কমিশন নিয়ে নিম্নমানের ও আর্দ্রতাযুক্ত চাল ঢোকানোরও একাধিক অভিযোগ রয়েছে।
সরকারি খাদ্য অধিদপ্তরের বস্তা ব্যবসায়ীরা কীভাবে পেল এবং এসব অনিয়মের বিষয়ে জানতে চাইলে খাদ্য পরিদর্শক ও সদর খাদ্য গুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর হোসেন ক্যামেরার সামনে কথা বলতে রাজি হননি। তিনি বিষয়টি নিয়ে পরে ‘নিরিবিলিতে’ কথা বলার অনুরোধ জানান। এছাড়া পরবর্তীতে সে মোবাইলে আরো বলেন, এটা নিয়ে কোন নিউজ হবে না, নিউজ হলে সাংবাদিকের এলাকা ছাড়া করে দেব। আমার ক্ষমতা সম্পর্কে আপনাদের ধারণা নেই।
এ বিষয়ে জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক সুবীর নাথ চৌধুরী মুঠোফোনে জানান, সরকারি বস্তা বাইরে দেওয়ার কোনো নিয়ম নেই। কৃষকরা নিজস্ব বস্তায় ধান নিয়ে আসবেন এবং গুদামের শ্রমিকরা তা ওজন করে সরকারি বস্তায় ভরবেন। সিন্ডিকেটের মাধ্যমে এভাবে ধান ঢোকানো অন্যায়। বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হবে।
উল্লেখ্য, চলতি মৌসুমে ঝিনাইদহ সদর খাদ্য গুদামে কৃষকদের কাছ থেকে প্রতি মণ ১৪৪০ টাকা মূল্যে মোট ১ হাজার ৬০০ মেট্রিক টন ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এছাড়া প্রতি কেজি ৪৯ টাকা দরে ৮ হাজার ৬৫১ মেট্রিক টন চাল সংগ্রহ করা হবে। এই সংগ্রহ অভিযান আগামী আগস্ট মাস পর্যন্ত চলবে।