
সাতক্ষীরার দেবহাটায় অর্ধকোটি টাকার খাল পুনঃখনন প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ
মোমিনুর রহমান, সাতক্ষীরা :
পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন, কৃষি সেচ সুবিধা বৃদ্ধি এবং অতি দরিদ্র মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য নিয়ে সরকারের উদ্যোগে সাতক্ষীরার দেবহাটা উপজেলার বোয়ালমারী খাল পুনঃখনন প্রকল্প হাতে নেওয়া হলেও, শুরু থেকেই প্রকল্পটি ঘিরে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। প্রায় অর্ধকোটি টাকার এ প্রকল্পে নকশা অনুযায়ী খনন না করা, শ্রমিকের পরিবর্তে ভেকু (এক্সকাভেটর) মেশিন দিয়ে কাজ সম্পন্ন, নিম্নমানের বৃক্ষরোপণ এবং ভুয়া মাস্টাররোল তৈরির মাধ্যমে সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে ক্ষোভে ফুঁসছেন স্থানীয় কৃষক ও এলাকাবাসী।
স্থানীয় প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, বোয়ালমারী খাল পুনঃখননের জন্য ৫১ লাখ ৫৩ হাজার ৯৯৫ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। প্রকল্পের আওতায় ১৩ হাজার ২৬৯ দশমিক ৪৪০ ঘনমিটার মাটি অপসারণ এবং ১১৯ জন উপকারভোগী শ্রমিকের মাধ্যমে কাজ বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে। শ্রমিকদের দৈনিক ৫০০ টাকা করে মজুরি দেওয়ারও কথা।
এছাড়া প্রকল্পে স্লোপ স্ট্যাবিলাইজেশন ও পরিচর্যার জন্য ৩ লাখ ৪৯ হাজার ৪৬০ টাকা এবং বৃক্ষরোপণের জন্য আরও ৬ লাখ ৬৬ হাজার ৬০০ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
কিন্তু সরেজমিনে দেখা গেছে, প্রকল্পের বাস্তব চিত্র কাগজে-কলমের তথ্যের সঙ্গে মিলছে না। অভিযোগ রয়েছে, অধিকাংশ কাজই শ্রমিকের পরিবর্তে ভেকু মেশিন দিয়ে করা হয়েছে। খালের নকশা অনুযায়ী গভীর ও প্রশস্ত করে খননের পরিবর্তে কেবল উপরের অংশের মাটি কেটে দুই পাশে ফেলে রাখা হয়েছে। এতে অনেক স্থানে খাল আগের তুলনায় আরও সরু হয়ে পড়েছে বলে দাবি স্থানীয়দের।
স্থানীয়দের ভাষ্য, খালের মাঝখানের অংশে পর্যাপ্ত খনন করা হয়নি। দুই পাশের মাটি তুলে পাড়ে ফেলে রাখায় সামান্য বৃষ্টিতেই সেই মাটি আবার খালে ধসে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে পানি নিষ্কাশন ও সেচ ব্যবস্থার যে উন্নয়নের কথা বলা হচ্ছে, তা বাস্তবে কোনো সুফল বয়ে আনবে না।
এছাড়া প্রকল্পের আওতায় লাগানো অধিকাংশ গাছের চারা নিম্নমানের হওয়ায় ইতোমধ্যে শুকিয়ে যেতে শুরু করেছে। এলাকাবাসীর অভিযোগ, বরাদ্দের অর্থ ব্যয়ের যথাযথ প্রতিফলন প্রকল্পে দেখা যাচ্ছে না।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন কৃষক, মৎস্যঘের মালিক ও স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, “সরকার মানুষের কল্যাণে কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ দিচ্ছে। কিন্তু কিছু অসাধু ব্যক্তি সেই অর্থ লুটপাটের সুযোগ হিসেবে নিচ্ছে। খননের নামে আইওয়াশ করা হয়েছে। খালের মাঝখান ঠিকমতো খনন করা হয়নি, বরং অনেক জায়গায় খাল আগের চেয়েও ছোট হয়ে গেছে। প্রথম বৃষ্টিতেই কাটা মাটি আবার খালে ভেঙে পড়বে।”
প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির সভাপতি আব্দুল মতিন বকুল বলেন, “আগে যে গাছগুলো রোপণ করা হয়েছিল, সেগুলো উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার নির্ধারিত ঠিকাদারের মাধ্যমে লাগানো হয়েছে। চারাগুলোর মান ভালো নয় এবং অনেক গাছ মারা গেছে। আগামী কয়েক দিনের মধ্যে নতুন করে গাছ রোপণ করা হবে।”
অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মফিজুর রহমান বলেন, “কাজ এখনও চলমান রয়েছে। কোথাও নকশা অনুযায়ী কাজ না হলে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারকে বিল দেওয়া হবে না। প্রয়োজনে পুনরায় সঠিকভাবে কাজ সম্পন্ন করা হবে।”
এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মিলন সাহা বলেন, “খাল পুনঃখনন কাজে অনিয়মের অভিযোগ পেলে বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
এদিকে এলাকাবাসীর দাবি, সরকারি অর্থের সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করতে অবিলম্বে উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করে পুরো প্রকল্পের কাজ যাচাই করতে হবে। পাশাপাশি অনিয়ম ও দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ এবং নকশা অনুযায়ী খালের পুনঃখনন সম্পন্ন করার জোর দাবি জানিয়েছেন তারা।