মাঙ্কিপক্স ও প্রাসঙ্গিক ভাবনা: ড. মো: ইকবাল কবির জাহিদ

http://www.71news24.com/2019/03/18/1128

২০২০ সালের ১৭ এপ্রিল শুরু করেছিলাম করোনার বিরুদ্ধে এক যুদ্ধ। গত কয়েক মাস একটু স্বস্থির নিঃশ্বাস ফেলেছিলাম করোনা নামক শত্রুকে সাময়িক পরাজিত করার আনন্দে। কিন্তু সেই আনন্দ দীর্ঘায়িত হলো না। গত ৬ মে যুক্তরাজ্যে মাঙ্কিপক্স শনাক্ত হওয়ার খবরে আমি ছাড়াও সারা পৃথিবীর মানুষ কিছুটা হলেও আতঙ্কিত। গত ৬ মে যিনি প্রথম আক্রান্ত হয়েছিলেন তিনি নাইজেরিয়া ভ্রমণ করেছিলেন- এমন সম্পর্ক থাকলেও বর্তমানে সারা পৃথিবীতে ৪৭টি দেশে প্রায় ১৫০০ অধিক শনাক্ত হয়েছে; যারা সবাই আফ্রিকা থেকে আসেনি। ফলে এই ভাইরাস নিয়ে চিন্তাভাবনার সময় এসেছে। মাঙ্কিপক্স সম্পর্কে আলোচনায় আসতে হলে কিছু প্রাথমিক বৈজ্ঞানিক তথ্য ও ইতিহাস জানা জরুরি। যদিও সাম্প্রতিককালে এটি আমাদের সামনে আসছে। কিন্তু এটি অনেক আগের একটি জানা ব্যাধি।

মাঙ্কিপক্স কী?

১৯৫৮ সালে ডেনমার্কে একটি ল্যাবরেটরিতে প্রথম বাঁদর থেকে এই ভাইরাস শনাক্ত করা হয় দেখে একে মাঙ্কিপক্স বলে। কিন্তু বাঁদরই প্রধান বাহক। কিন্তু না এই মাঙ্কিপক্সের ইুঁদুর, কাঁঠবিড়ালী শ্রেণীই প্রধান বাহক এই রোগের। ১৯৭০ সালে কঙ্গোতে সর্বপ্রথম দেখা যায়। এরপর রোগটি প্রধানত মধ্য ও পশ্চিম আফ্রিকাতে দেখা যায় এবং মাঝে মাঝে অন্য অঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়ে। কেউ যদি মাঙ্কিপক্স সম্পর্কে উইকিপিডিয়াতে দেখেন, তবে সম্পূর্ণ দেখতে পাবেন। ১৯৭০ সালের পরে বিভিন্ন সময়ে আফ্রিকা ও আফ্রিকার অঞ্চলগুলোতে কমবেশি প্রায় সবসময় ছিল। ২০১১ ও ২০১৪ সালেও প্রায় ২০০০ রোগী শনাক্ত হয়। কিন্তু চিন্তার বিষয় যেটা সেটা হলো আফ্রিকার বাইরে আমেরিকাতে ২০০৩, ২০১৭-১৯ নাইজেরিয়া, ২০১৯ সিঙ্গাপুর ও ২০২১ যুক্তরাজ্যে কিছু ছড়ায়। কিন্তু যদি ২০২২ সালের রিপোর্ট দেখি তবে দেখব ১৩ জুন পর্যন্ত ৪৭টি দেশে ১৬২৪টি রোগী শনাক্ত হয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়াটাই চিন্তার বলিরেখাকে বড় করে দেয়।

রোগের লক্ষণ কী?

আপনি যদি সহজভাবে মাঙ্কিপক্সের লক্ষণ জানতে চান তাহলে জ্বর, তীব্র মাথা ধরা, পেশী ব্যাথা, ব্যাক পেইন ও গ্লান্ড ফুলে যাওয়া। জ্বর সাধারণত ১-৫ দিনের মধ্যে গুটি বসন্তের মতো ফুসকুড়ি, ক্ষত হয়। প্রথমে হয় মুখে তারপর অন্যান্য অঙ্গে। যদি গুগলে ইমোজে যান এবং মাঙ্কিপক্স লেখেন তাহলে ফুসকুড়ি ছবি দেখতে পারেন। কিন্তু বিষটি অতো সহজ নেই এবারের মাঙ্কিপক্স। অনেকের শরীরে রোগটি ঠিক এইভাবে হচ্ছে না। ফুসকুড়িটিও ভিন্ন। আমেরিকাতে যে ৪৫ জনের শরীরে মাঙ্কিপক্স দেখা গেছে সেই সম্পর্কে সিডিসির বক্তব্য হলো- ‘র‌্যাশ নয়, পিম্পল টাইপ হচ্ছে। শরীরের সব অঙ্গেও হচ্ছে- এমন না কিছু কিছু অংশে হচ্ছে।’ ফলে আমরা অনেক ক্ষেত্রেই বিভ্রান্ত হচ্ছি।

কেন রোগের লক্ষণ ভিন্ন?

পক্স পরিবারের একটি ভাইরাস মাঙ্কিপক্স। ফলে গুটিবসন্তের সঙ্গে তার অনেক মিল, প্রধানত দুই ধরনের হয়। একটিকে বলে ওয়েস্ট আফ্রিকান ও অন্যটিকে বলে কঙ্গো বেসিন। কিন্তু বর্তমানে যেটি বিভিন্ন দেশে ছাড়িয়েছে সেটির প্রায় ৪০টি মিউটেশন বা পরিবর্তন পাওয়া গেছে। ফলে আগের তুলনায় বেশি দেশে ছাড়িয়ে পড়েছে। সেটির লক্ষণও এই মিউটেশনের কারণে ভিন্ন।

কীভাবে ছড়ায়?

এই প্রশ্নটিই আমাদের সাধারণ মানুষদের জানাটা বেশি প্রয়োজন। প্রধানত ছড়ায় যেসব প্রাণী এদের বাহক যেমন- ইঁদুর ও কাঁঠবিড়ালীর মাধ্যমে; তাই এটিকে প্রাণিবাহিত রোগ বলা হয়। কিন্তু সারা বিশ্বে যেটি ছড়িয়ে যাচ্ছে সেটি কিন্তু মানুষ থেকে মানুষে ছড়াচ্ছে। বসন্ত টাইপ যেভাবে ছড়ায় সেই একইভাবে রোগীর ক্ষতের অংশ শুকনা চামড়ায় অংশ বা কাপড় চোপড়ে লেগে থাকা জীবাণু থেকে ছড়িয়ে যেতে পারে। সাম্প্রতিক কালে সমকামী মানুষদের ছড়ানোর সম্ভাবনা কথাও জোর দিয়ে বলা হচ্ছে। এখন বলি বাতাসের মাধ্যমে ছড়ানোর কথা। আশার বাণী হলো- সিডিসি বলছে, মাঙ্কিপক্স করোনার মতো লম্বা সময় বাতাসে থাকে না বা বাতাস দিয়ে ছড়ায় না। শুধুমাত্র আক্রান্ত রোগীর সরাসরি মুখের সঙ্গে কথা বলা বা সংস্পর্শের মাধ্যমে ছড়াতে পারে। মাঙ্কিপক্স আক্রান্ত ব্যক্তির কাছাকাছি আসার ক্ষেত্রে অবশ্যই মাস্ক পরতে হবে। এই ভাইরাস কয়েক মিটারের বেশি যেতে পারে না ফলে করোনার মতো ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা কম।

কতটা ভয়ঙ্কর?

মাঙ্কিপক্স খুব ভয়ঙ্কর রোগ নয়, যদিও কঙ্গো বেসিন টাইপের মৃত্যুহার ১০ ভাগ। এ কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। যেটি এই মুহূর্তে ছড়িয়ে পড়েছে সেটি প্রধাণত দক্ষিণ আফ্রিকার টাইপ এবং এটির মৃত্যুহার মাত্র ১ ভাগের ও নিচে। যদিও গড়পড়তাভাবে বলা হচ্ছে ৩-৬ ভাগ মৃত্যুহার। এর পরের বক্তব্য হল ১৯৭০ সাল থেকে হিসাব করলে এখন পর্যন্ত ১০০০০ বেশি রেগী পাওয়া যায় নাই। ফলে প্রকৃত মৃত্যুহার যাচাই অসম্ভব। তাই মাঙ্কিপক্স নিয়ে আতঙ্ক নয়, জরুরি হলো সচেতনতা।

হতাশা কোথায়?

মানুষ করোনার কারণে ভাবছে মাঙ্কিপক্স একইভাবে আসবে কিনা? সেটি ভিন্ন প্রশ্ন। কিন্তু হতাশার বাণী হলো- এতদিন পর্যন্ত মাঙ্কিপক্সকে বিরল রোগ বলা হলেও সেটি ৪৭টি দেশে ১৬০০ জনকে আক্রান্ত করতে পেরেছে। ফলে বিশ্বের স্বাস্থ্য সংস্থা বিপরীতমুখী বক্তব্য দিচ্ছে। ইউরোপীয়ান ইউনিয়ন এক লাখ ডোজ গুটিবসন্তের টিকা মজুত করেছে। এখন বিজ্ঞানীরা দুটি হাশার কথা বলেছেন। একটি হলে এটি বাতাসের মাধ্যমেও কম বেশি ছড়তে পারে। দ্বিতীয় হলো মিউটেশন ঘটেছে ফলে কিছুটা হলেও যন্ত্রণা দিবে। সেটি বিভিন্ন দেশে কমবেশি ছড়িয়ে পড়বে।

আশা কোথায়?

সাম্প্রতিক করোনার হতাশার পরে আশার বাণীটাই বেশি প্রয়োজন। মাঙ্কিপক্স নিয়ে আতঙ্কের কারণ নেই যে সকল বৈজ্ঞানিক তথ্যের কারণে তার কিছু বর্ণনা দিই। প্রথম, মাঙ্কিপক্স দুই-সূত্র বিশিষ্ট ডিএনএ ভাইরাস ফলে করোনার মতো একই অঙ্গে বহুরূপ দেখানো খুবই কঠিন। এটি যারা জেনেটিকের ধারণা রাখেন তারা আরও ভাল বুঝবেন। দ্বিতীয়, বাতাস প্রধান বাহক না হওয়াতে করোনার মতো ছড়াতে পারবে না। ফলে প্রচুর মানুষ আক্রান্ত হবে না। যখন কেউ রেগীর সংস্পর্শে আসবে তখন পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নিলেই হবে। তৃতীয়ত, কোনরূপ বাহ্যিকভাবে রোগ শনাক্ত করা যাবে না এমনটি এখন পযর্ন্ত ঘটে নাই মাঙ্কিপক্স। যেহেতু মাঙ্কিপক্সের উপসর্গ গুটিবসন্তের মতো এবং এক থেকে তিন দিনের মধ্যে ফুসকুড়ি উঠে মুখে শুরু হয়ে সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে ফলে সহজেই রোগীকে পৃথক করে আইসোলেশনে পাঠানো যাবে। করোনার ক্ষেত্রে প্রধানত সমস্যাই ছিল উপসর্গহীন হওয়া। চতুর্থত, সরাসরি মাঙ্কিপক্সের টিকা নেই।

কিন্তু গুটিবসন্তের টিকা প্রায় ৮৫-৯০ ভাগ কার্যকরী মাঙ্কিপক্সের বিরুদ্ধে। ফলে কোন এলাকায় যদি বেশি হয় সঙ্গে সঙ্গে এই টিকা দেওয়া যাবে। করোনার ক্ষেত্রে টিকা পেতে দেরি হয়েছিল এক্ষেত্রে তা ঘটবে না।

কেন বারবার মহামারী বা শঙ্কা?

পৃথিবীর বিখ্যাত সাময়িকী ন্যাচার বা সাইন্সের অনেক প্রবন্ধে আছে এই ব্যাখ্যা। আমরা আমাদের প্রাকৃতিক পরিবেশকে করে ফেলেছি ধ্বংস। ফলে কমে যাচ্ছে প্রাণীকুল। যেসব ভাইরাস আগে অন্য প্রাণীতে থাকত তারা সেখানে বাসস্থান না পেয়ে মানুষের শরীরে বেঁচে থাকতে চায়। রবিঠাকুরের মতো- ‘মরিতে চাহিনা আমি সুন্দর ভূবনে, মানবের মাঝে আমি বাঁচিবারে চাই। এই সূর্যকার এই পুষ্পিত কাননে জীবন্ত হৃদয় মাঝে স্নান পাই। ভাইরাস কি চাইতে পারে না? ইঁদুর না পেলে সুন্দর মানুষের শরীরে জায়গা পেতে?’

বাংলাদেশের করণীয় কী?

মাঙ্কিপক্সের শনাক্তকরণের জন্য কিছু কিট সরবরাহ রাখা যেতে পারে। প্রত্যেকটা স্থল, নৌ ও আকাশপথে পর্যাপ্ত মনিটরিং ব্যবস্থা রাখা; যাতে এ ধরনের রোগী আসলে শনাক্ত হয়। অণুজীব বিজ্ঞানীদের বন্দরগুলোতে নিয়োগ প্রদান করলে তারা প্রকৃত রোগী শনাক্ত করতে পারবে। এছাড়া ইউরোপীয়ান ইউনিয়নের মতো অল্প কিছু টিকাও কেনা যেতে পারে। পরিশেষে বলব, ভয় নয় আতঙ্ক নয়, মহামারী শঙ্কার মধ্যে বীরের মতো বেঁচে থাকার নামেই হয়তো হবে আগামীর দিনগুলো।

 

[লেখক : অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান, অণুজীব বিজ্ঞান বিভাগ এবং সহযোগী পরিচালক, জিনোম সেন্টার, যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়]