যুদ্ধ বা অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা কখনই মঙ্গলজনক নয়ঃ জাতিসংঘে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা

http://www.71news24.com/2019/03/18/1128

শেখ গফ্ফার রহমান, স্টাফ রিপোর্টারঃ

জোরপূর্বক অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা বা পাল্টা-নিষেধাজ্ঞা কখনও কারও জন্য মঙ্গলজনক নয়। জাতিসংঘের ৭৭তম অধিবেশনের ভাষণ এ কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

 

শুক্রবার (২৩ সেপ্টেম্বর) নিউইয়র্কের স্থানীয় সময় বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৭৭তম অধিবেশন দেয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, আমরা যুদ্ধ চাই না, শান্তি চাই। একটি মানবিক বিশ্ব গড়তে চাই। বাসযোগ্য করে রেখে যেতে চাই আগামি প্রজন্মের জন্য। সে দায়বদ্ধতা আমাদের সকলের।

 

শেখ হাসিনা বলেন, পারমানবিক অস্ত্রের বিস্তাররোধসহ সম্পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণে বাংলাদেশ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। বলেন, ফিলিস্তিনি জনগণের প্রতি বাংলাদেশের মানুষের সমর্থন অব্যাহত থাকবে। এছাড়া রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে প্রত্যাবানসের বিষয়ে আলোচনার পরও তাদের নিজ জন্মভূমিতে ফেরত পাঠানো যায় নি। এবিষয়ে জাতিসংঘকে শক্ত ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী।

 

ভাষণে শেখ হাসিনা বলেন, গত আড়াই বছরেরও বেশি সময় ধরে করোনা মহামারীর মারাত্মক প্রভাব যখন বিশ্ববাসী সামলে উঠতে শুরু করেছে, তখনই রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাত বিশ্বকে নতুন করে খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা, জ্বালানি এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিয়েছে।

 

শেখ হাসিনা বলেন, চলমান নিষেধাজ্ঞায় টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনের ক্ষেত্রে সহায়তা প্রার্থী ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলো আরও প্রতিকূলতার মুখে পড়েছে। বর্তমানে আমরা এমন একটি সংকটময় সময় অতিক্রম করছি, যখন অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে অধিক পারস্পরিক সংহতি দেখানো জরুরি।

 

বাংলাদেশের সরকার প্রধান বলেন, আমাদের প্রমাণ করতে হবে, সংকটের মুহূর্তে বহুপাক্ষিক ব্যবস্থার মূল ভিত্তি হলো জাতিসংঘ। তাই সর্বস্তরের জনগণের বিশ্বাস ও আস্থা অর্জনের জন্য জাতিসংঘকে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়ে সকলের প্রত্যাশা পূরণে কাজ করতে হবে।

 

যুদ্ধ বা একতরফা জবরদস্তিমূলক অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, পাল্টা-নিষেধাজ্ঞার মত বৈরী পন্থা কখনো কোনো জাতির মঙ্গল বয়ে আনতে পারে না। পারস্পরিক আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সংকট ও বিরোধ নিষ্পত্তি সর্বোত্তম উপায়।

 

শেখ হাসিনা বলেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রণীত পররাষ্ট্রনীতির মূল প্রতিপাদ্য হচ্ছে ‘সকলের সাথে বন্ধুত্ব, কারও সাথে বৈরিতা নয়’। বাংলাদেশ জন্মলগ্ন থেকেই এই প্রতিপাদ্য-উদ্ভূত জোটনিরপেক্ষ নীতি অনুসরণ করে আসছে।

 

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৯৭৪ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর এই মহান পরিষদে বঙ্গবন্ধু তার প্রথম ভাষণে বলেছিলেন, শান্তির প্রতি যে আমাদের পূর্ণ আনুগত্য তা এই উপলব্ধি থেকে জন্মেছে যে, একমাত্র শান্তিপূর্ণ পরিবেশেই আমরা আমাদের কষ্টার্জিত জাতীয় স্বাধীনতার ফল আস্বাদন করতে পারি। ক্ষুধা, দারিদ্র্য, অশিক্ষা ও বেকারত্বের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করার জন্য আমাদের সকল সম্পদ ও শক্তি নিয়োগ করতে সক্ষম হবো।

 

সরকার প্রধান বলেন, বিশ্বে উত্তেজনা হ্রাস করার পাশাপাশি অস্ত্র প্রতিযোগিতা সীমিত করতে হবে। এশিয়া, আফ্রিকা ও ল্যাটিন আমেরিকাসহ পৃথিবীর প্রত্যেকটি স্থানে শান্তিপূর্ণ সহ-অবস্থান নীতি জোরদার করতে হবে। এজন্য জাতিসংঘকে জোরালো ভূমিকা রাখতে হবে।

 

জাতিসংঘ অধিবেশনে বাংলাদেশের উন্নয়নের চিত্র তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জিডিপির হিসাবে বাংলাদেশ অবস্থান এখন ৪১তম। বিগত এক দশকে আমরা দারিদ্র্যের হার ৪১ শতাংশ থেকে ২০.৫ শতাংশে নামিয়ে এনেছি। আমাদের মাথাপিছু আয় মাত্র এক দশকে তিনগুণ বৃদ্ধি পেয়ে ২ হাজার ৮২৪ মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়েছে।

 

শেখ হাসিনা জানান, করোনার প্রাদুর্ভাবের আগে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে আমাদের জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৮ দশমিক ১৫ শতাংশ। এর আগে, আমরা টানা তিন বছর ৭ শতাংশের বেশি জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছি। মহামারি চলাকালেও ২০২০-২১ অর্থবছরে বাংলাদেশের অর্থনীতি ৬ দশমিক ৯৪ শতাংশ হারে প্রসারিত হয়েছে।

 

ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ এবং অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ও পাল্টা নিষেধাজ্ঞার ফলে সরবরাহ ব্যবস্থায় ব্যাঘাত এবং জ্বালানি, খাদ্যসহ নানা ভোগ্যপণ্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি পেয়েছে উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, এ কারণে আমাদের মতো অর্থনীতি মারাত্মক চাপের মুখে পড়েছে। মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি পেয়েছে। এ অবস্থা কাটিয়ে ওঠার জন্য আমরা বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করছি।

 

সরকার প্রধান জানান, ২০২৬ সালে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তীর্ণ হতে যাচ্ছে। আমরা ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে একটি জ্ঞানভিত্তিক উন্নত দেশে রূপান্তরিত করার জন্য এবং ২১০০ সালের মধ্যে একটি সমৃদ্ধ ও জলবায়ু-সহিষ্ণু বদ্বীপে উন্নীত করার লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছি।

 

সর্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষা, খাদ্য নিরাপত্তা, মা ও শিশু মৃত্যু হ্রাস, লিঙ্গ বৈষম্য, নারীর ক্ষমতায়নসহ নানা ক্ষেত্রে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, গত এক দশকে বাংলাদেশে সাক্ষরতার হার ৫০ শতাংশ থেকে ৭৫ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। মানুষের গড় আয়ু এখন ৭৩ বছরের বেশি।

 

বাংলাদেশ তথ্যপ্রযুক্তি নির্ভর শিক্ষাব্যবস্থা নিশ্চিত করতে গুরুত্বারোপের পাশাপাশি সমাজের সবচেয়ে দুর্বল ব্যক্তিদের প্রতি বিশেষ মনযোগ দিয়েছে উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, সমাজের কেউ যেন পিছিয়ে না থাকে সেজন্য কাজ করছে বাংলাদেশ সরকার।

 

স্বামী-পরিত্যক্তা নারী, বিধবা, বয়স্ক ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, তৃতীয় লিঙ্গ এবং অন্যান্য প্রান্তিক জনগোষ্ঠির সামাজিক ও আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতা বাড়ানো হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বিশ্ব নেতাদের জানান, বর্তমানে প্রায় ১ কোটি ৭০ লাখ মানুষ সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় উপকৃত হচ্ছেন।

 

উন্নত ভৌত অবকাঠামো মজবুত অর্থনৈতিক কাঠামোর ভিত্তি হিসেবে কাজ করে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা নদীর তলদেশের টানেল, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে এবং ম্যাস র‌্যাপিড ট্রানজিট সিস্টেমসহ টেকসই বৃহৎ অবকাঠামো নির্মাণ করছি। আমাদের সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থায় সম্প্রতি যুক্ত হয়েছে আমাদের নিজস্ব অর্থায়নে নির্মিত পদ্মা বহুমুখী সেতু।

 

পদ্মা সেতু বাংলাদেশের স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যকে সহজতর করার পাশাপাশি আঞ্চলিক যোগাযোগ বৃদ্ধি এবং জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে ১ দশমিক ২৩ শতাংশ হারে অবদান রাখবে বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।